দিল্লি হাইকোর্টে বড় ধাক্কা নেহা বোরার: নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও শান্তিভঙ্গের অভিযোগ, পুলিসের নোটিস বাতিলের মামলায় হার আইসা নেত্রীর
Neha Bora: দিল্লি হাইকোর্টে ধাক্কা খেলেন আইসা নেত্রী নেহা বোরা। মান্ডি হাউস বিক্ষোভ ও শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় জারি ১০ হাজার টাকার পিচ বন্ড নোটিস বহাল রাখল আদালত।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (Special Intensive Revision - SIR) অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner - CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচদের সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলনে আইনি ধাক্কা খেলেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা-র (AISA) নেত্রী নেহা বোরা (Neha Bora)। স্পেশাল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের (Special Executive Magistrate - SEM) জারি করা শান্তি বজায় রাখার নোটিস বা 'পিস বন্ড' (Peace Bond Notice) বাতিল করার আর্জি জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে (Delhi High Court) আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে শুক্রবার বিচারপতি সুব্রহ্মণ্যম প্রসাদের (Justice Subramonium Prasad) বেঞ্চ সেই রিট পিটিশন সরাসরি খারিজ (Petition Dismissed) করে দিল।
আদালতের সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, ম্যাজিস্ট্রেটের শোকজ নোটিস শুধুমাত্র লোকমুখে শোনা তথ্যের (Hearsay Material) ওপর দাঁড়িয়ে নেই। পুলিসের জেনারেল ডায়েরি এবং পূর্ণাঙ্গ মামলা নথি বা কলন্দরা (Kalandara Case File) পর্যালোচনা করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কেন নোটিস জারি করেছিল দিল্লি পুলিস?
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬। ককরোচ জনতা পার্টির (Cockroach Janta Party - CJP) উদ্যোগে আয়োজিত 'লহরা দো তিরঙ্গা' (Lahara Do Tiranga) মিছিলের অংশ হিসেবে মান্ডি হাউস (Mandi House) থেকে কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কের দিকে জেনজিদের নিয়ে এগোচ্ছিলেন নেহা বোরা। সেখান থেকেই তাঁকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে (Preventive Custody) নেয় দিল্লি পুলিস। প্রায় ১২ ঘণ্টা আটক থাকার পর ১৭ অক্টোবর সকালে তিনি মুক্তি পান।
তবে মুক্তির পরেই ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১২৬, ১৩০ এবং ১৩৫(৩) ধারায় নেহাকে তলব করেন স্পেশাল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।
তদন্ত চলাকালীন শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখার জন্য তাঁকে ১০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ড (₹10,000 Personal Bond) এবং একজন উপযুক্ত জামিনদার (Surety) পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টে নেহা বোরার সওয়াল
নোটিসকে 'অস্পষ্ট, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' আখ্যা দিয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২৬ (Article 226) প্রয়োগ করে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন নেহা। তাঁর আইনজীবী অভীক চিমনি (Advocate Abhik Chimni) আদালতে দাবি করেন:
জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জন্য কোনও ভারতীয় নাগরিকের পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই।
গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তনের (Regime Change) দাবি তোলা কোনও অপরাধ হতে পারে না।
সেন্ট্রাল পার্কের মূল কর্মসূচির সঙ্গে মান্ডি হাউসের জমায়েতের সাংগঠনিক ফারাক ছিল।
দিল্লি পুলিসের সওয়াল
পাল্টা যুক্তিতে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ও দিল্লি পুলিসের কৌঁসুলিরা দাবি করেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সরকার পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম হল বৈধ নির্বাচন। কোনও সংরক্ষিত এলাকায় বিশৃঙ্খলা বা বেআইনি জমায়েত করে প্রশাসনিক কাজকর্ম ব্যাহত করা যায় না।
মান্ডি হাউস ও ১৬৩ ধারার নিষেধাজ্ঞা
মামলার অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ছিল মান্ডি হাউসে নিষেধাজ্ঞার উপস্থিতি। আবেদনকারীর দাবি ছিল, মান্ডি হাউস চত্বরে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল না। কিন্তু আদালতের কাছে দিল্লি পুলিস নথি পেশ করে দেখায়, গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বারাকাম্বা রোড সাব-ডিভিশনের সহকারী পুলিস কমিশনার (ACP) বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার (Section 163 BNSS - পূর্বতন ১৪৪ ধারা) অধীনে নির্দেশিকা জারি করেছিলেন। বারাকাম্বা রোড ও তিলক মার্গ থানা এলাকার ভৌগোলিক চৌহদ্দির মধ্যে মান্ডি হাউস অন্তর্ভুক্ত। নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো সত্ত্বেও ভিড় জমায়েত ও স্লোগান দেওয়া হয়েছিল।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি সুব্রহ্মণ্যম প্রসাদ তাঁর পর্যবেক্ষণে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার প্রতিরোধমূলক ক্ষমতার আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন:
১. শাস্তিমূলক নয়, প্রতিরোধমূলক: পিস বন্ড কোনও অপরাধের শাস্তি (Punitive) নয়। এটি ভবিষ্যতে শান্তিভঙ্গ ঠেকানোর আগাম সতর্কতা (Preventive Measure)।
২. ঘটনার সংখ্যা জরুরি নয়: জনশান্তি বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বহু ঘটনার প্রয়োজন নেই, একটিমাত্র ঘটনাই (Single Incident) ম্যাজিস্ট্রেটের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
৩. ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি (Subjective Satisfaction): তিনটি জেনারেল ডায়েরি ও সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে এসইএম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই প্রাথমিক তদন্তপর্যায়ে আদালত ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির বিকল্প বিচারক হিসেবে বসতে পারে না।
নির্দেশিকা ও সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচ
হাইকোর্ট পিটিশন খারিজ করলেও সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক 'মধু লিমায়ে বনাম এসডিএম মোঙ্গের (1970)' মামলার রায়ের ভিত্তিতে নেহা বোরার জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করেছে:
১. যে সমস্ত গোপন বা আনুষ্ঠানিক পুলিসি নথির ওপর ভিত্তি করে নোটিস জারি করা হয়েছে, তার সমস্ত প্রতিলিপি শুনানির আগেই নেহা বোরাকে দিতে হবে।
২. তদন্তের শুরুতেই জোরপূর্বক বন্ড দিতে বাধ্য করা যাবে না; বিএনএসএস-এর ১৩৫ নম্বর ধারার সারবত্তা বুঝে তদন্তের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে ম্যাজিস্ট্রেট বন্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
৩. ম্যাজিস্ট্রেটের চূড়ান্ত নির্দেশের পর ক্ষুব্ধ হলে নিম্ন আদালতের রিভিশন বা সেশন কোর্টে আপিল করার পূর্ণ আইনি অধিকার থাকবে আবেদনকারীর।
সব মিলিয়ে ককরোচ আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই জেনজি দ্রোহ বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তার দিকে তাকিয়ে দেশ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)