অরূপ রাহা: ঋণের ১৯ লক্ষ টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে শ্যামনগর থেকে গ্রেপ্তার বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর প্রাক্তন পিএ। সেই ঘটনায় স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও জনসাধারণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন পাপিয়া অধিকারী। ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগর থেকে এক ঠিকাদারকে গ্রেপ্তার করে বর্ধমান থানার পুলিশ। ধৃতের নাম সায়ন্তন সান্যাল। জানা যায়, তিনি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহায়ক (পিএ) ছিলেন। অভিযোগ, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক রেল ঠিকাদারের কাছ থেকে কয়েক দফায় মোট ২৫ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন সায়ন্তন। পরে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিলেও বাকি ১৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকা ফেরত দেননি বলে অভিযোগ। এরপরই সোমবার ভোররাতে জগদ্দল থানার পুলিসের সহযোগিতায় শ্যামনগরের ব্যানার্জিপাড়া রোডে নিজের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনাটি কী?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব বর্ধমানের রায়না থানার সেহারাবাজারের বাসিন্দা বিশ্বরূপ সাহা পেশায় রেলের ঠিকাদার। ঠিকাদারি কাজের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সায়ন্তনের। তিনিও পেশায় ঠিকাদার। একই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় দু’জনের মধ্যে আর্থিক লেনদেন চলত। মাঝেমধ্যেই বিশ্বরূপের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন সায়ন্তন এবং পরে তা ফেরতও দিতেন। এর ফলে দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগকারীর দাবি। অভিযোগ, সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েক দফায় বিশ্বরূপের কাছ থেকে মোট ২৫ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা ধার নেন সায়ন্তন। পরে নিজের স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বিশ্বরূপকে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেন তিনি। বাকি ১৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকাও পরে মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
কী অভিযোগ?
বিশ্বরূপের অভিযোগ, চলতি বছরের ১৭ মার্চ সায়ন্তন তাঁকে এসএমএস করে জানান, তাঁর স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে বিশ্বরূপের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৫ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি বলে দাবি বিশ্বরূপের। এরপর একাধিকবার টাকা ফেরত চেয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে অভিযোগ। উল্টে নানা অছিলায় টাকা ফেরত দেওয়া এড়িয়ে যেতে থাকেন সায়ন্তন। এমনকী, বিশ্বরূপের সঙ্গে যোগাযোগও এড়িয়ে চলতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বর্ধমানের মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতের দ্বারস্থ হন বিশ্বরূপ। তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্তের জন্য বর্ধমান থানার আইসিকে নির্দেশ দেয় আদালত। সেই মামলার তদন্তে নেমেই সায়ন্তনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পাপিয়া অধিকারীর পোস্ট
ধৃতকে বর্ধমান সিজেএম আদালতে পেশ করা হলে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে চার দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায় পুলিশ। তবে ভারপ্রাপ্ত সিজেএম ধৃতকে দু’দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গিয়েছে, পুজোর মধ্যেই সায়ন্তনকে ব্যক্তিগত সহায়কের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। সায়ন্তন সান্যালের গ্রেফতারির পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় এক দীর্ঘ পোস্টে বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী জানিয়েছেন, "স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস-আস্থা নিয়ে কোনওরকম আপস চলবে না।" তিনি লিখেছেন-
"টালিগঞ্জের প্রিয় বাসিন্দারা,
অত্যন্ত দুঃখ এবং গভীর দায়িত্ববোধের সঙ্গেই আমি আমার প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী সায়ন্তল সান্যালকে ব্যক্তিগত সহায়কের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সম্পর্কে আপনাদের কিছু কথা জানাতে চাই।
শ্রী সান্যালকে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শুরুতে দেখানো সততা ও নিষ্ঠার ভাবমূর্তি দেখেই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পরবর্তীতে তাঁর আচরণ সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ ও নানা তথ্য আমার নজরে আসে, যা তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ওই পদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তোলে।
আমার নির্বাচনী এলাকার কাজে অনধিকার প্রবেশ, আমার নাম ও পদের অপব্যবহার, অনুচিত আর্থিক লেনদেন, চাঁদাবাজির চেষ্টা এবং অন্যান্য অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ আমার কানে আসে। এ ছাড়াও, বিজেপির কিছু সিনিয়র নেতাও উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
এই অভিযোগগুলির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং স্বচ্ছতার প্রতি আমার আপসহীন প্রতিশ্রুতির কথা মাথায় রেখে, আমি আগেই তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমার অফিসের সঙ্গে তাঁর পেশাগত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলাম।
পরবর্তীতে, ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এ, আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে বর্ধমান থানার ৫৭০/২০২৬ নম্বর মামলায় (তারিখ ১৮.০৫.২০২৬, বি.এন.এস-এর ৩১৮(৪) ধারা অনুযায়ী) বর্ধমান পুলিশ শ্রী সায়ন্তন সান্যালকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানতে পেরেছি। আমি যতদূর জানি, এই বিষয়টি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে আদালতে করা অভিযোগ থেকে শুরু হয়েছিল, যার ভিত্তিতে মে মাসে পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করে।
এছাড়াও, ২০১৪ সালের একটি মামলা সহ তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে বা বর্তমানে বিচারাধীন অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। কোনও সঠিক তথ্য প্রমাণসহ পেলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সামনে পেশ করা হবে।
যাঁকে আমি উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব দিয়ে বিশ্বাস করেছিলাম, এমন একজন মানুষের এই কর্মকাণ্ডে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই মর্মাহত। তবে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চেয়ে জনস্বার্থ ও জবাবদিহিতা সবসময় অনেক বড়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং একমাত্র আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অপরাধ প্রমাণিত হতে পারে।
আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দিতে চাই যে, শ্রী সায়ন্তল সান্যাল আর আমাকে বা আমার অফিসকে প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং আমার নাম, পদ বা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করার তাঁর বিন্দুমাত্র কোনও অধিকার বা ক্ষমতা নেই।"
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)