জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: জীবনের অন্ধকার ও যন্ত্রণার দিকই তাঁর ছবিতে বেশি জায়গা করে নিয়েছে-- এমনই দাবি শিল্পসমালোচকদের। তবে, তিনি চলে গেলেন কিন্তু আলোকিত উৎসবের আবহেই। ছবির জীবনের সঙ্গে মিলল না জীবনের ছবি। যোগেন চৌধুরী। চলে গেলেন বাংলা তথা ভারতের চিত্রকলার জগৎকে অন্ধকার করে দিয়ে। শ্রীময়ী লক্ষ্মীদেবীর আরাধনালগ্নে ছবির দুনিয়াকে শ্রীহীন করে চিরতরে বিদায় নিলেন একুশ শতকের ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি। ২০১৪ সালে রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। যোগেন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকের আবহ শিল্পজগতে।
প্রয়াত যোগেন
চলে গেলেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী। বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। ছিলেন ভেন্টিলেশনে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সম্প্রতি দুর্গাপুজোর সময় আক্রান্ত হন মূত্রনালীর সংক্রমণে। সেই থেকেই ভর্তি হাসপাতালে। চলে গেলেন ৮৪ বছরে।
রেখা ও রঙ, মূর্ত ও বিমূর্ততা
যোগেন চৌধুরীচিত্রকর্মগুলি তাঁর শৈল্পিক সৃজনধর্মিতা ও বহুমুখী প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর অনন্য শৈলী, যা ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় মোটিফের সঙ্গে আধুনিক কৌশলের সংমিশ্রণ ঘটায়, তৈরি করে আপন অনন্যতা। রেখা এবং রঙই হল ছবির প্রাণ। যোগেন চৌধুরী নিজেও রেখার একজন ওস্তাদশিল্পী। তিনি তাঁর শিল্পে বক্ররেখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বক্ররেখাসৃষ্ট তাঁর অনন্য অবয়বগুলিতে ফুটে ওঠে তাঁর এক নিজস্ব ধাঁচের সৃজনধর্মিতা। আকৃতির সতর্ক বিকৃতির মাধ্যমে তিনি তাঁর নারী-পুরুষ অবয়বে এমন এক আবহ সৃষ্টি করেন, যাকে ঠিক কোনও সংজ্ঞায় ভূষিত করা চলে না। অবয়বে যা অভিব্যক্ত হয় তার সুর কীভাবে দ্রষ্টার দর্শনে বিম্বিত হয়-- তার রাস্তা কে বলে দেবে? শিল্প তাই তো শেষ পর্যন্ত রূপের মূর্ত প্রকাশের পথ আঁকড়েও বিমূর্তই। আর যোগেন যেন সেই মূর্ত বিমূর্ততার অন্যতম রূপকার।
দেওয়ালের ময়ূর থেকে মাটির দুর্গা
১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার। ছবি আঁকতে ও মূর্তি গড়তে ভালবাসতেন। মায়ের মধ্যে ছিল শিল্পীর গুণপনা। মা-ও আঁকতেন। এসবই কোনও ভাবে আসে হয়তো তাঁর মধ্যে। পিতার জামিদারী সংক্রান্ত কাগজপত্রের পৃষ্ঠদেশে আঁকাবুকির মধ্য দিয়ে শৈশবেই যোগেন চৌধুরীর ছবিতে হাতেখড়ি। আর কলকাতার বাসায় দেয়ালে একটি ময়ূরের ছবি এঁকেছিলেন, যেটিকে তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম চিত্রকর্ম বলে মনে করা হয়। কুমোর যখন দুর্গা বানাতে আসত, তখন খুব মনোযোগ দিয়ে সব দেখত ছোট্ট যোগেন। খড়, তুষ, মাটি কীভাবে কুমোরের দক্ষ হাতে মুখ, হাত, আঙুল হয়ে উঠত, সেসবে রোমাঞ্চিত হতেন তিনি। এভাবেও শৈশবেই তাঁর মধ্যে শিল্পবোধ জাগ্রত হয়।
ফরিদপুর থেকে প্যারিস
১৯৪৮ সালে কলকাতায় চলে আসা। কলকাতাতেই শিল্পশিক্ষা। ১৯৫৫ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে পড়াশোনা করেন যোগেন চৌধুরী। ১৯৬০ সালে ডিগ্রি অর্জন। হাওড়া জেলা স্কুলে শিল্পের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটরের দায়িত্বপালন। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে মাদ্রাজেও টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। এরপর তাঁর প্যারিসযাত্রা।
পিকাসো থেকে স্ব-রেখায়
১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে শিল্পশিক্ষার জন্য যান যোগেন। প্যারিসে শিল্প-অধ্যয়নের অভিজ্ঞতা তাঁর চিত্রনির্মাণে আনে আধুনিকতার ছোঁয়া। জলরং, প্যাস্টেল, তেল রং, কালি-- সব মাধ্যমেই কাজ করতে থাকেন। তাঁর প্রথম দিককার শিল্পকর্মে পিকাসোর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় বলে মত শিল্পতাত্ত্বিকদের। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয় একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রাধান্য পেয়ে এসেছেন। সামগ্রিক ভাবে ভারতীয় শিল্প আন্দোলন ও ইওরোপীয় শিল্প আন্দোলনের প্রভাব দেখা যায় তাঁর আঁকায়। তবে এসবের পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব ঘরানার জোর তো ছিলই। ভারতভাগের পরে কলকাতার শরণার্থী শিবিরে দেখা উদ্বাস্তু নারী-পুরুষের বহু প্রতিকৃতি তিনি অঙ্কন করেন তিনি। এই সব ছবিতে বলিরেখা বোঝাতে যে হ্যাচিং (সমান্তরাল রেখা পরপর অঙ্কন) ও ক্রস-হ্যাচিং-এর ব্যবহার তিনি আরম্ভ করেন, সেইগুলিই পরবর্তীকালে তাঁর রচনাশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)