সম্প্রীতির বাংলা! দেবীর ঘন কালো কেশ বোনেন মুসলিম কারিগররাই, শোভা পায় মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমায়
Durga Puja: ঠিক কোন পূর্বপুরুষ আগে এই কাজ শুরু হয়েছিল, তা তিনি মনে করতে পারেন না। তবে শেখ নবাবের এটুকু মনে আছে যে দাদুর কাছ থেকেই তিনি এই কাজ শিখেছিলেন। চুল কলকাতার কুমোরটুলি, বিহার, উত্তর প্রদেশ, নেপাল, এমনকি বাংলাদেশেও সরবরাহ করা হয়।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলার মাটিতে সম্প্রীতির এক অনন্য গল্প। মুসলিম কারিগরদের হাতেই তৈরি হয় দেবী দুর্গার কেশ। যে কেশ শোভা পায় মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমায়। রাজ্যের বিভিন্ন পুজো মণ্ডপগুলিতে দেবী দুর্গার যে ঘন, কালো, কোঁকড়ানো কেশ দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা মূলত তৈরি করেন হাওড়ার আমতা এলাকার পর্বতপুর গ্রামের মুসলিম কারিগররা। এই গল্প অনেকেই হয়তো জানেন না!
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুসারে, কলকাতা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পর্বতপুর গ্রামটি বারগাছিয়া রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত। ৩৭ বছর বয়সী শেখ নবাব এই গ্রামে দুর্গা প্রতিমার কৃত্রিম চুল (উইগ) তৈরির সবচেয়ে বড় ব্যবসা পরিচালনা করেন। ঠিক কোন পূর্বপুরুষ আগে এই কাজ শুরু হয়েছিল, তা তিনি মনে করতে পারেন না। তবে এটুকু মনে আছে যে দাদুর কাছ থেকেই তিনি এই কাজ শিখেছিলেন।
শেখ নবাব বলেন, “প্রতিমার চুল তৈরির কাজ মূলত দুটি ধাপে হয়। আমরা প্রথমে পাট সংগ্রহ করে তা রঙ করি, এরপর কয়েকজন কারিগর দিয়ে সেগুলো সেলাই করাই। সেলাই করতেই সবচেয়ে বেশি সময় লাগে। আমরা নিজেরাই কারিগরদের কাজ শেখাই।” বাড়ির এক কোণে দুটি কুঁড়েঘরে এই কাজের ব্যবস্থা করেছেন শেখ নবাব। একটি জায়গায় তাঁর দুই ভাই বড় কয়লার উনুনে সাদা পাট কালো করার জন্য রঙ ফোটান।
এরপর রঙ করা পাটগুলো শুকাতে দেওয়া হয়। পাশেরই আরেকটি ঘরে পাঁচজন মহিলা সেলাই মেশিনে সেই কাঁচা কালো পাট দিয়ে চুল সেলাইয়ের কাজ করেন। শেখ নবাব বস্তাভর্তি শত শত চুলের প্যাকেট দেখান। প্রতিটি বস্তা প্রায় ৯,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। এসব চুল মূলত কলকাতার কুমোরটুলি, বিহার, উত্তর প্রদেশ, নেপাল, এমনকি বাংলাদেশেও সরবরাহ করা হয়।
কমছে আয়, বাড়ছে সংকট
এত প্রচেষ্টার পরও পর্বতপুরের এই অভিজ্ঞ কারিগরদের আয় আগের মতো হচ্ছে না। শেখ ইনজামাম নামের অন্য এক কারিগর বলেন, “অসময়ের বৃষ্টি এবং গত দুই-তিন বছরে পাটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কারণে আমাদের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও তাঁদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছে। “বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেখানকার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে ওই রুটে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন আমাদের অধীনে কাজ করা আশেপাশের গ্রামের শত শত শ্রমিকের মজুরি দিতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি।”
বর্তমানে এক ইউনিট পাটের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, যা দুই-তিন বছর আগেও ছিল মাত্র ৯০ টাকা। তাছাড়া, কারিগরদের মতে, কলকাতার স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম চুল তৈরির কারখানাগুলোর সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় টেক্কা দেওয়া তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্পীরা এখন পর্বতপুরের হস্তশিল্পের বদলে কলকাতার কয়েকটি বড় কারখানার যান্ত্রিক চুলের ওপর বেশি নির্ভর করছেন।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)