হাঁড়িকাঠসমতে মোষ চলে এল এ বাড়িতে! ৪০০ বছরের অভয়া দুর্গার দ্যুতিতে আজও উজ্জ্বল বিকে পাল
Howrah's B K Paul's Durga Puja: ছাদের চিলেকোটার ঘরটাও বন্ধ। যেখানে একসময় হত কত আড্ডা। পুরনো বাড়ি ভেঙে কিছু নতুন নির্মাণ হয়েছে। তবুও সেই বনেদিয়ানার নস্টালজিয়া রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা যে যেখানেই থাকুক, সেই নস্টালজিয়ার টানে ছুটে আসেন পুজোর সময়।
দেবব্রত ঘোষ: হাওড়ার শিবপুরে বটকৃষ্ণ পালের জন্মভিটেতে অভয়া রূপে আজও পূজিতা হন মা দুর্গা। আজও সেখানে হয় পাঁঠা ও মোষবলি। হাওড়ার শিবপুরের নব গোপাল মুখার্জি লেনের পালবাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। কলকাতার বি কে পাল অ্যাভিনিউ যাঁর নামে, সেই বটকৃষ্ণ পালের জন্ম হয় এই বাড়িতেই। বাংলা তথা ব্রিটিশশাসিত ভারতের বিখ্যাত ওষুধ প্রস্তুতকারক বটকৃষ্ণ পাল। ভারতের অন্যতম বিখ্যাত ফার্মাসিস্ট।
৪০০ বছরের অভয়া দুর্গাপুজো
এহেন বটকৃষ্ণ পালের জন্মভিটেতেই আজও নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয় এই অভয়া দুর্গাপুজো। ভগ্নদশার তিন খিলানের দুর্গা দালানটি এখনও প্রাচীন স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। পুজোর জৌলুস কমলেও পুরনো রীতি ও নিয়মে কোনও ছেদ পড়েনি।
পাল পরিবারের আদি বসতভিটেতে শুরু হওয়া এই পুজোর সূত্রপাত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকলেও, এই পরিবারের মতে, স্বপ্নাদেশ থেকেই এই দেবীর আরাধনা শুরু। প্রায় চারশো বছর আগে শুরু হয় এই পুজো।
কালাজ্বর থেকে অভয়া
কালাজ্বরের ওষুধ তৈরি করেছিলেন বি কে পাল। সেই কাজই বটকৃষ্ণ পালকে তাঁর সময়ে প্রবল জনপ্রিয় করে। সেই সূত্রেই তাঁর খ্যাতি ও প্রতিপত্তি। ক্রমে দেবীর আরাধনার শুরু। এ বাড়িতে দেবী দুর্গা পূজিতা হন অভয়া রূপে। মা এখানে দশভুজা নন। অস্ত্রহীন দেবীর দু’হাতের একটিতে অভয়া মুদ্রা, অন্য হাতে ফল ও প্রস্ফুটিত পদ্ম। সিংহবাহিনী দেবীর সঙ্গে মহিষাসুর নেই। একচালার প্রতিমার দুপাশে থাকেন চার সন্তান। অসুরবধের পর মানুষকে অভয় দেন মা দুর্গা। অবশ্যই পুজোর সবচেয়ে বেশি জৌলুস ছিল বটকৃষ্ণ পালের সময়েই।
হাওড়া-ব্রিটেন-শোভাবাজার
১৮৬৫ সালে এই বাড়িতেই বটকৃষ্ণ পালের জন্ম। বটকৃষ্ণ পাল অ্যান্ড কোম্পানির ওষুধের সুখ্যাতি ব্রিটেনেও ছড়িয়েছিল। তাঁর নামে শোভাবাজারের রাস্তা ও শিবপুরের স্কুলের নামকরণ হয়েছে। শাক্তমতে পুজো হলেও অন্নভোগ হয় না। লুচি, মিষ্টি, নাড়ু ও ফল নিবেদন করা হয়। সপ্তমীতে ধুনো পোড়ানো হয়। অষ্টমীতে কুমারী পূজো হয়। নবপত্রিকা স্নান হয় দুর্গা দালানে। বিশেষ পাত্রে গঙ্গা-সহ অন্যান্য নদী ও সমুদ্রের জল রাখা হয়। সপ্তমী অষ্টমীতে পাঁঠা ও নবমীতে মোষ বলি ও মানসিক করা পাঁঠা বলির রীতি আজও রয়েছে। বলির প্রসাদ পরিবারের সদস্যরা গ্রহণ করেন না। কথিত আছে, কিছুটা দূরে একটি বনেদি বাড়িতে মোষ বলির সময় হাঁড়িকাঠ সমেত ওই মোষ চলে আসে পাল বাড়িতে। তখন থেকেই হয়ে আসছে মোষ বলি। সন্ধিপুজোয় বাড়ির মেয়েদের অংশ নেওয়ার রীতি নেই।
নস্টালজিয়া
প্রাচীন দুর্গা দালানটিকে ধরে রেখেই পুজো চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। একান্নবর্তী এই পরিবার এখন ভেঙেছে। পুরনো বাড়ির ইট বেরিয়ে এসেছে। জমেছে শ্যাওলা। জন্মেছে আগাছা। ছাদের চিলেকোটার ঘরটাও বন্ধ। যেখানে একসময় হত কত আড্ডা। পুরনো বাড়ি ভেঙে কিছু নতুন নির্মাণ হয়েছে। তবুও সেই বনেদিয়ানার নস্টালজিয়া রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা যে যেখানেই থাকুক, সেই নস্টালজিয়া ও এবাড়ির পুজোর টানে ছুটে আসেন পুজোর সময়। সবাই মিলিত হন। চলে চুটিয়ে আড্ডা আনন্দ খাওয়া দাওয়া। আর আশেপাশের সমস্ত লোকজন এই পুজোয় সামিল হন। বনেদি বাড়ির এই পুজো সার্বজনীন হয়ে ওঠে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)