অন্ধকার নামলেই শুনশান প্ল্যাটফর্ম! পুরুলিয়ার যে স্টেশনে ট্রেন থামতেও ভয় পায়...
Purulia: ১৯৬৬ সালে স্টেশন মাস্টারের ছড়ানো ভূতের গুজব। সেই কারণে দীর্ঘ ৪২ বছর বন্ধ ছিল পুরুলিয়ার বেগুনকোদর স্টেশন। ২০০৭ সালে এটি প্যাসেঞ্জার হল্ট হিসেবে পুনরায় চালু হয়। বর্তমানে দিনে টিকিট এজেন্টের উপস্থিতিতে কয়েকটি ট্রেন থামলেও, সন্ধ্যার পর পুরো স্টেশন জনশূন্য হয়ে যায়।
মনোরঞ্জন মিশ্র: ভূত চতুর্দশী এলেই পুরুলিয়াবাসীর মুখে উঠে আসে একটিই নাম। পুরুলিয়ার বেগুনকোদর রেল স্টেশন। আজও সন্ধ্যে নামলেই শুনশান হয়ে যায় গোটা স্টেশন চত্বর। টিকিট ঘরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তালা। স্থানীয়রাও আর স্টেশনমুখী হতে চান না। রাত নামলে এই স্টেশনে থামে না কোনও ট্রেন। রাত যত বাড়ে, ততই নিজর্ন স্টেশন চত্বর যেন আরও ছমছমে পরিবেশ হয়ে ওঠে। ঠিক যেন হরর সিনেমার মতো। ভুতুড়ে স্টেশন বলেই পরিচিত এই স্টেশন। পুরুলিয়ার ঝালদার কাছে বেগুনকোদর স্টেশনটি দক্ষিণ-পূর্ব রেলের রাঁচি ডিভিশনের মুরি-কোটশিলা শাখার অধীনে। আর পাঁচটা রেল স্টেশনের এটি নয়।
এখানে নেই স্টেশন মাস্টার, রেল পুলিস বা কোনও রেল কর্মী। দিনের বেলা টিকিট ঘরের ক্যাবিনে বসে থাকেন এজেন্ট কর্মী। তিনিই টিকিট কাটার ব্যবস্থা করেন। দিনের বেলা হাতে গোনা কয়েকটি লোকাল ট্রেনের স্টপেজ রয়েছে এখানে। সন্ধ্যে নামলেই ট্রেন থামে না এখানে। তাই টিকিট ঘরে তালা ঝুলিয়ে চলে যান ওই স্টেশনের দায়িত্বে থাকা এজেন্ট। জনহীন ফাঁকা স্টেশনটি খাঁ খাঁ করতে থাকে। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকে একেবারে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়ে স্টেশন চত্বর।
আরও পড়ুন: উৎসব কাটলেই দুর্যোগের চোখরাঙানি! কলকাতা-সহ জেলায় জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ তুমুল বৃষ্টি
১৯৬০ সাল নাগাদ এই স্টেশন গড়ে ওঠে। স্টেশন মাস্টার ছাড়াও তখন আরেকজন কর্মী ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের রাঁচি ডিভিশনের এই স্টেশনের পাশের গ্রাম বামনিয়া। কিন্তু মৌজা বেগুনকোদর। তাই স্টেশনের নাম বেগুনকোদর। বছর ছয়েক চলার পরেই স্টেশন মাস্টারের বানানো ভূতের গল্পের কারণে ১৯৬৬ সালে দরজা বন্ধ হয়ে যায় স্টেশনের। রটে যায় এখানকার স্টেশন মাস্টার ভূতের ভয়ে রাতারাতি সব ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তারপর থেকে আর কেউ এখানে না আসায় স্টেশন কার্যত বন্ধই হয়ে যায়। কোনো রেল কর্মী বা স্টেশন মাস্টার এই স্টেশনে ভয়ে আসতেন না।
এলাকাবাসীরা জানান, সেই সময় স্টেশন মাস্টার ছিলেন তাঁর তিন মেয়ে। এলাকায় ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছিল মেয়েরা। বদলি চাইছিলেন তিনি। না মেলায় ভূতের গল্প ফাঁদেন। ভূতের ভয়ে কেটে যায় ৪০ টি বছর । তারপর ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাঁকুড়ার তৎকালীন সাংসদ বাসুদেব আচারিয়ার চেষ্টায় বেগুনকোদর স্টেশনটি প্যাসেঞ্জার হল্ট হিসেবে ফের খুলে যায়। পরিত্যক্ত স্টেশন বিল্ডিংটিকেই নতুন করে মেরামত করে তৈরি হয় টিকিট কাউন্টার ও যাত্রী প্রতীক্ষালয়। দেওয়া হয় কয়েকটি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের স্টপ। কিন্তু রেল শর্ত দেয় শুধু দিনের বেলায় এই স্টেশনে ট্রেন থামবে।
আরও পড়ুন: ইন্টারভিউ পাশ, হাতে অফার লেটার! তবু হল না জয়েনিং, রাতারাতি বাতিল সম্পূর্ণ প্যানেল
রেলের একজন এজেন্ট দিয়ে সেখানে টিকিট বিক্রি করা হবে। তারপর থেকে সেই রেওয়াজ আজও চলছে। আজও কোনো রেল কর্মী, রেল পুলিস বা স্টেশন মাস্টার নেই এখানে। শুধু সময় বদলেছে। কিন্তু ‘ভূত-ভূত’ গা ছমছমে ভাব যেন আজও কাটেনি এখানে। একাধিক প্রযোজক সংস্থা এই স্টেশনে তথ্যচিত্রও তৈরি করেছেন। আজও সন্ধ্যে নামলেই জনমানবহীন এই স্টেশন।
যদিও ওই রেল স্টেশনের জমিদাতা পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একটা ভূতের গুজব ছড়িয়েছিল। কিন্তু এর সত্যতা নেই। স্টেশন মাস্টার বদলির জন্য ভূতের গুজব ছড়িয়েছিলেন। আজ স্টেশনের হাল ফিরেছে। বেশ কয়েকটি ট্রেন এখানে দাঁড়ায়। তবে আরও ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া হলে এবং রেল কর্মীদের মোতায়েন হলে ভালো হবে। স্বাভাবিক ছন্দে ফিরুক এই স্টেশন চাইছে জেলার মানুষ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)