জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: লোকসভার অলিন্দে ফের তুঙ্গে বাংলার সংসদীয় রাজনীতির পারদ। দলত্যাগ বিরোধী আইনের (Anti-Defection Law) আওতায় সাংসদ পদ খারিজের আবেদনের মুখে পড়ে আবারও লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Lok Sabha Speaker Om Birla) কাছে সময় চাইলেন এনসিপিআই (Nationalist Citizens Party of India বা NCPI)-এর ২০ জন সাংসদ।
মঙ্গলবার স্পিকারকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে তাঁরা জবাব পেশের জন্য আরও অতিরিক্ত তিন সপ্তাহের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুরোধ জানিয়েছেন। এর আগে তাঁদের আবেদনের ভিত্তিতে স্পিকার দফতর থেকে দুই সপ্তাহের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছিল, যার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে আজই। তবে রাজনৈতিক ও সংসদীয় মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-- পরপর ছয় বার সময় চাওয়ার পর স্পিকার ওম বিড়লা কি তাঁদের এই নতুন আর্জিতে সাড়া দেবেন, নাকি সরাসরি শুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন?
বিতর্কের সূত্রপাত ও সাংবিধানিক জট
বিতর্কের মূলে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে পরবর্তীতে এনসিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা অন্তর্ভুক্তির (merger) দাবি ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি সংঘাত। সংবিধানের দশম তফশিল (Tenth Schedule) অনুযায়ী, মূল রাজনৈতিক দলের ছাড়পত্র ছাড়া কোনও সাংসদ দলত্যাগ করলে তাঁর সদস্যপদ খারিজযোগ্য। তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে লোকসভার স্পিকারের কাছে এই ২০ জন সাংসদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে অবিলম্বে সদস্যপদ খারিজের পিটিশন (Disqualification Petition) দাখিল করা হয়।
তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচিত প্রতীক ছেড়ে অন্য দলে যুক্ত হওয়া পুরোপুরি অসাংবিধানিক। বিপরীতে, বিদ্রোহী সাংসদদের যুক্তি-- তাঁরা আইনসম্মতভাবেই পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে একত্রিত হয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম গ্রহণ করেছেন।
কেন বারবার সময় চাওয়া হচ্ছে?
সাংসদদের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, স্পিকারের দফতরের পাঠানো নোটিসের আইনি ও সাংবিধানিক উত্তর তৈরির জন্য প্রচুর নথি ও নজির খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।
নথিপত্র একত্রীকরণ (Compilation of Legal Documents): ত্রিপুরা বা জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ এবং সংবিধানের দশম তফশিলের ব্যাখ্যা প্রস্তুত করতে সময় লাগছে।
সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি (Apex Court Monitoring): মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের নজরেও রয়েছে এবং শীর্ষ আদালতও পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছে। ফলে আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করতে কোনও তাড়াহুড়ো করতে চাইছেন না সংশ্লিষ্ট সাংসদরা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শুনানি যত পিছিয়ে দেওয়া যাবে, লোকসভায় নিজেদের অবস্থান ও সাংসদ পদ তত বেশি দিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। তাই সময় চেয়ে এই আইনি লড়াইকে দীর্ঘায়িত করাই প্রধান কৌশল।
স্পিকারের কী অবস্থান?
‘আর সময় নয়’স্পিকারের দফতর সূত্রে আগেই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, বারবার সময়সীমা বাড়ানো আর বরদাস্ত করা হবে না। লোকসভা সচিবালয়ের নিয়মানুযায়ী, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যুক্তিসঙ্গত সুযোগ (Reasonable Opportunity) দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে না।
ইতোমধ্যেই পাঁচ বার সময়সীমা পার হওয়ার পর ষষ্ঠবারের এই আবেদনে তিন সপ্তাহের বাড়তি ছাড় চাওয়া কার্যত স্পিকারের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। সচিবালয় সূত্রের দাবি, স্পিকার এবার কঠোর মনোভাব দেখিয়ে সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন নাকচ করে একতরফা শুনানির দিন ঘোষণা করতে পারেন।
এবার কী হতে পারে?
১. সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ছাড় (Final Ultimatum): সংসদীয় রীতির খাতিরে স্পিকার শেষবারের মতো কয়েকদিন বা বড়জোর এক সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত সময় মঞ্জুর করতে পারেন।
২. আবেদন খারিজ ও তাৎক্ষণিক শুনানি (Direct Hearing): সময় চাওয়ার চিঠি সরাসরি খারিজ করে মূল অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত সাংসদদের সশরীরে হাজিরার নির্দেশ দিয়ে শুনানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারেন।
৩. পদ খারিজের ঝুঁকি (Risk of Disqualification): জবাব দাখিলে ব্যর্থ হলে সংবিধানের দশম তফশিলের বিধান অনুযায়ী সদস্যপদ খারিজের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হতে পারে।বাংলার এই ২০ জন সাংসদের ওপর ঝুলছে বড়সড় সাংবিধানিক খাঁড়া। স্পিকারের টেবিল থেকেই নির্ধারিত হবে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, বিজনেস, লাইফস্টাইল, কেরিয়ার, ইউটিলিটির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের Facebook, Whatsapp Channel, X, Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)