জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিগ টেক কোম্পানিগুলোতে কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর নতুন নয়। তবে এবার গণছাঁটাইয়ের (Mass Layoffs) মতো বিতর্কিত ও নির্মম পথ এড়িয়ে এক কৌশলী নরম পন্থা বেছে নিয়েছে টেক জায়ান্ট গুগল (Google)। এই কোম্পানি সরাসরি বরখাস্ত না করে কর্মীদের সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে দিচ্ছে আকর্ষণীয় ‘ভলান্টারি বাইআউট’ (Voluntary Buyouts) বা স্বেচ্ছাবসর প্যাকেজের অফার।
আমেরিকা ও ইউরোপের পর সম্প্রতি জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, জাপান এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও কর্মীদের জন্য এই স্বেচ্ছাবসর কর্মসূচি (Voluntary Exit Program) বাড়িয়ে তুলছে গুগলের মূল সংস্থা অ্যালফাবেট (Alphabet)।
কিন্তু হঠাৎ কেন সরাসরি ছাঁটাই না করে মোটা টাকা দিয়ে কর্মীদের পদত্যাগ করতে উৎসাহিত করছে সুন্দর পিচাইয়ের সংস্থা? কী রয়েছে এই ‘ভলান্টারি বাইআউট’ প্যাকেজে?
বিভিন্ন তথ্য থেকে উঠে এসেছে, যেসব কর্মী স্বেচ্ছায় এই অফার গ্রহণ করছেন, তাঁদের জন্য আকর্ষণীয় বিচ্ছেদ প্যাকেজ বা ‘সেভারেন্স পে’ (Severance Pay) বরাদ্দ করা হচ্ছে। যেমন সুইজারল্যান্ডের মতো টেক হাবে কর্মীদের প্রতি কাজের বছরের জন্য এক মাসের সম্পূর্ণ বেতন অফার করা হয়েছে, কাউকে তা সর্বোচ্চ ১২ মাসের বেতন পর্যন্তও দেওয়া হচ্ছে।
যাঁরা কোম্পানির দ্রুত বদলে যাওয়া অগ্রাধিকার বা কাজের গতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছেন না, তাঁদের কোনও দাগ ছাড়াই সসম্মানে বেরিয়ে যাওয়ার নিরাপদ পথ করে দেওয়া হচ্ছে।
কেন সরাসরি ছাঁটাইয়ের বদলে এই কৌশল?
গুগলের এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে তিনটি বড় কৌশলগত ও আইনি কারণ
ইউরোপের কঠোর শ্রম আইন (Strict European Labour Laws): ইউরোপের দেশগুলোতে আইন খুবই কড়া। সেখানে ঢালাও ছাঁটাই করতে গেলে কর্মী সংগঠন বা ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াই, প্রতিবাদ ও জনরোষের মুখে পড়তে হয়। অতীতে জুরিখে কর্মী ছাঁটাই নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। স্বেচ্ছাবসর দিলে সেই আইনি ঝামেলা পুরোটাই এড়িয়ে যাওয়া যায়।
ব্র্যান্ড ভাবমূর্তি রক্ষা (Reputational Safeguard): গণছাঁটাইয়ের নোটিস দিলে শেয়ার বাজার এবং সংবাদমাধ্যমে কোম্পানির সুনাম ধাক্কা খায়। পক্ষান্তরে, ‘স্বেচ্ছায় বিদায়’ বললে সেই নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই লঘু হয়ে যায়।
কাজের সংস্কৃতিতে অসন্তোষ ঠেকানো: এক দফায় চাকরি হারালে বাকি কর্মীদের মনে প্রবল ছাঁটাই-ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। স্বেচ্ছাবসরের ক্ষেত্রে কর্মী নিজেই তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পান।
আসল অনুঘটক
এআই পরিকাঠামোর বিপুল ব্যয়ভার এই কর্মী সংকোচন কার্যক্রমের নেপথ্যে রয়েছে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) রেসে টিকে থাকার বিপুল আর্থিক চাপ।
গুগলের মূল সংস্থা অ্যালফাবেট এখন তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে এআই ডেটাসেন্টার তৈরি, চিপস ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের পরিকাঠামোয়। এর ফলে যে বিভাগগুলোতে কোম্পানির কাজের পরিধি কমেছে, সেখান থেকে কর্মীদের বিদায় করা হচ্ছে।
অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গুগলের এআই গবেষণাগার ‘ডিপমাইন্ড’ (Google DeepMind) কিংবা গুগল ক্লাউড (Google Cloud) বিভাগের কোনও কর্মীকে এই বাইআউট অফারের আওতায় রাখা হয়নি! অর্থাৎ, এআই দক্ষতায় যাদের প্রয়োজন, তাদের রেখে বাকি চিরাচরিত বিভাগে ব্যয় ছাঁটাই চলছে।
কর্মীদের ভবিষ্যৎ কী?
মাইক্রোসফটের মতো অন্যান্য প্রযুক্তি সংস্থাও ইতোমধ্যে কর্মী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি খাতে কাজের ধাঁচ বদলে গেছে। যে কর্মী নিজে থেকে এআই-বান্ধব দক্ষতায় নিজেকে আপগ্রেড করতে পারছেন না, বড় টেক কোম্পানিগুলো তাদের সফট উপায়ে বিদায় করার এই ফর্মুলাই এখন বেছে নিচ্ছে।